দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এ খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রবাহ কমে এসেছে। এর ফলে ঋণের স্থিতিও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিকট অতীতে সিএমএসএমই খাতের ঋণ স্থিতি এভাবে কমে যেতে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সিএমএসএমই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ স্থিতি ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতের ঋণ স্থিতি কমেছে ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ কম। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সিএমএসএমই খাত সম্প্রসারিত না হয়ে উল্টো সংকুচিত হয়েছে।
ঋণ স্থিতির এ নিম্নমুখী প্রবণতা শুধু আগের প্রান্তিকেই সীমাবদ্ধ নয়; এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায়ও সিএমএসএমই খাত এখন পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে এ খাতে মোট ঋণ স্থিতি ছিল ৩ লাখ ২ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সে অবস্থান থেকেও নিচে নেমে এসেছে খাতটি।
গতকাল প্রকাশিত ‘কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অন সিএমএসএমই ফাইন্যান্সিং’-এর চলতি বছরের মার্চ সংখ্যায় এ চিত্র তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে সিএমএসএমই খাতের ঋণ পোর্টফোলিও পরিস্থিতি, নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ঋণের গুণগত মান, বিকল্প বিতরণ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থায়ন এবং ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণ কার্যক্রম পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সিএমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। আর দেশের মোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশই এ খাতের। কৃষিবহির্ভূত মোট কর্মসংস্থানেরও প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সৃষ্টি হয় সিএমএসএমই খাত থেকে। সারা দেশে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই ঢাকার বাইরে। ফলে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নেও এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও মনে করে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য সিএমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য। এ লক্ষ্য অর্জনে খাতটির বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেবল সিএমএসএমই নয়, বরং সামগ্রিকভাবেই দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর ঋণপ্রবাহ বেশ কম। অর্থনীতিতে যাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে চেষ্টা করছে। এজন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে। তহবিলগুলোর প্রায় অর্ধেকই সিএমএসএমই, কৃষিসহ গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আশা করছি, চলতি প্রান্তিক থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে ঋণের প্রবাহও বাড়বে।’
দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে উৎসাহিত করতে কয়েক বছর ধরেই নানা পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও সেসব পদক্ষেপ ও উদ্যোগ তেমন কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণ স্থিতির ন্যূনতম ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করার কথা। কিন্তু মার্চে এ স্থিতি নেমে এসেছে ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে। গত কয়েক বছর ধরেই এ অংশীদারত্ব না বেড়ে উল্টো পথে হাঁটছে। সর্বশেষ গত বছরের মার্চেও এ স্থিতি ১৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো সিএমএসএমই খাতে মোট ঋণ বিতরণ করেছে ৫২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করেছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকটি সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো পূবালী, সিটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। এ পাঁচ ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ২০ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা গত প্রান্তিকে সিএমএসএমই খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪০ শতাংশ।
সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচে থাকা ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো হলো আইডিএলসি, লংকাবাংলা, আইপিডিসি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স ও অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স। এ পাঁচটি ফাইন্যান্স কোম্পানির বিতরণকৃত মোট ঋণ ছিল ২ হাজার ৭ কোটি টাকা।
ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেকই সিএমএসএমই খাতের বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শীর্ষ নির্বাহী তারেক রেফাত উল্লাহ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সিএমএসএমই খাতে অনেক ব্যাংক হয়তো শুধু মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করে। কুটির, ছোট বা ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে না। কিন্তু ব্র্যাক ব্যাংকের সিএমএসএমই পোর্টফোলিওতে এ খাতের সব স্তরের উদ্যোগেই বিনিয়োগ রয়েছে। বর্তমানে আমাদের ব্যালান্স শিটের প্রায় ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ সিএমএসএমই খাতের। আর এ খাতে আমাদের খেলাপি ঋণ মাত্র ২ শতাংশ।’
সিএমএসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের ক্রমবর্ধমান খেলাপির হার নিয়ে অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগও রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়, গত মার্চ শেষে সিএমএসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ২৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। একই সময়ে সামগ্রিক ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের গুণগত মানের এ অবনতি ব্যাংকগুলোকে নতুন করে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে আরো সতর্ক করে তুলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী উদ্যোক্তা ঋণের লক্ষ্য ১৫ শতাংশ হলেও অর্জিত হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণের লক্ষ্য ১০ শতাংশের বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। উৎপাদন খাতে ঋণের অংশও নির্ধারিত ৪০ শতাংশের নিচে নেমে ৩৪ দশমিক ৯৬ শতাংশে রয়েছে। অবশ্য বাণিজ্য খাতে ঋণের অংশ নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি হয়ে ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট সিএমএসএমই ঋণের ২৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণ অঞ্চলের ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪টি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ হয়েছে ১২ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ঋণ। তবে সামগ্রিক ঋণ স্থিতি কমে যাওয়ায় গ্রামীণ বাজার, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন এবং স্থানীয় ব্যবসায় অর্থের প্রবাহও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থায়ন সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একাধিক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর ফান্ড ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব এমএসএমই, ৩ হাজার কোটি টাকার ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং স্কিম, ১৮ হাজার কোটি টাকার নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং নারী উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যমান তহবিলের আকার বৃদ্ধি।
জাতীয় এসএমই নীতিমালা-২০১৯ অনুযায়ী, সিএমএসএমই খাতের সফল বিকাশ ছয়টি মূল ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো অর্থায়নের সুযোগ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে প্রবেশাধিকার, বাজারে প্রবেশ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক সহায়তা সেবা এবং তথ্যপ্রাপ্তি। এর মধ্যে অর্থায়নের সহজলভ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক সহায়তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।